ADS

নজর মোহাম্মদ আর পরীমনি ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ


নজর মোহাম্মদ আর পরীমনি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আফগানিস্তানের কান্দাহারের উপকণ্ঠে যুদ্ধ চলার সময় নজর মোহাম্মদ নামে একজন কৌতুক অভিনেতাকে তার বাড়ি থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছে।একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ধারাল অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করার পর রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তা থেকে কৌতুক শিল্পীর দেহ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা, অনেকের মতে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।কৌতুক অভিনেতার পরিবার নজর মোহাম্মদ হত্যার জন্য তালিবানদের দায়ী করেছে।অন্যদিকে তালিবানেরা এই হত্যার সাথে জড়িত থাকার কথা প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে একটি ভিডিও দেখে স্বীকার করতে বাধ্য হয়।সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা গাড়িতে থাকা অবস্থায় মৃত্যু অবধারিত জেনেও তিনি তালিবানদের নিয়ে রসিকতা করছিলেন; যা শুনে তার দুই পাশে বসা দুইজন তালিবান তাকে বারবার চড় মারছিলো এবং একজনকে পাশ থেকে বলতে শোনা যায়, ‘এই শত্রুকে আমরা হত্যা করবো, আমরা তাকে বাঁচাতে পারবো না’।নজর মোহাম্মদ পুলিশ অফিসার হলেও তিনি কখনো পুলিশের দায়িত্ব পালন করেননি, বিভিন্ন পুলিশ ক্যাম্পে গিয়ে মজার গান করা ছাড়াও সহকর্মীদের কাছ থেকে ছুঁড়ে দেয়া বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজা করে তাদের হাসাতেন।অন্যদিকে অনলাইনে হাস্যরসাত্মক নানান ভিডিও পোস্ট করার জন্যও আফগানদের কাছে তিনি কৌতুক অভিনেতা হিসেবে অনেক জনপ্রিয়।

নির্বাক চলচ্চিত্র যুগে চার্লি চ্যাপলিন সুপরিচিত একজন কৌতুক অভিনেতা ছিলেন।চার্লি চ্যাপলিন মানবজাতিকে হাসাতে চেয়েছেন, দর্শকও হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছে, হাসাতে হাসাতেই তিনি সাম্যবাদের বার্তা দিয়েছেন, সমাজের নানা বৈষম্য আর বঞ্চনার চিত্র দর্শকদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন।জুতা সেদ্ধ করে প্লেটে নিয়ে কাঁটা চামচ দিয়ে নুডলসের মতো পেঁচিয়ে জুতার ফিতা খাওয়ার যে অসাধারণ দৃশ্য তা শুধু হাসির নয়, হাসির মাঝে উঁকি দেয় বুভুক্ষের প্রচণ্ড ক্ষুধা।এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র একসময় কমিউনিস্ট বলে তাকে গালি দিয়ে আমেরিকা থেকে বের করে দিয়েছিলো।করিম আসিরকে বলা হয় আফগান চার্লি চ্যাপলিন; চার্লি চ্যাপলিন সেজে করিম আসির আমেরিকার সাথে তালিবানদের যুদ্ধ চলাকালীন সাধারণ আফগানদের উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করেছেন।তালেবানেরা তাকে বহুবার হত্যা করার হুমকি দিয়েছিলো।বিক্রমপুরের ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিনশত ছবিতে অভিনয় করেছেন এবং অধিকাংশ ছবিতেই তিনি দর্শকদের নির্মল হাসি উপহার দিয়েছেন।

তালেবান যখন আগেরবার আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল তখন তারা দেশটিতে সব ধরনের বিনোদন নিষিদ্ধ করেছিল।সিনেমা জগতটি ভিন্ন, এই জগতটি আমাদের ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভাল-মন্দ বিচারের কোন সুযোগ থাকবে না।কারণ ছবি তোলাই যেখানে নিষিদ্ধ সেখানে সিনেমায় ভাল-মন্দ, শ্লীল-অশ্লীল বিচার্য নয়।আমরা স্কুল জীবনে নাটক করেছি, তখন কোন নায়িকা পাওয়া যেত না, পুরুষকে শাড়ি বা শেলোয়ার-কামিজ পরে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করতে হতো।আমরা তখন জানতাম না যে, নারীর পোশাক পুরুষের পরা শুধু হারাম নয়, অভিশপ্ত কাজও।গ্রামের মৌলভী সাহেবেরা প্রতিবাদ করতেন, কিন্তু নাটক মঞ্চায়ন প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখতেন না।এখন আমাদের গ্রাম অঞ্চলে নাটক করা প্রায় অসম্ভব, আলেম সমাজ অনেক বেশী শক্তিশালী, প্রায় প্রতিটি গ্রামে মাদ্রাসা গড়ে উঠায় তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেড়ে গেছে।আমাদের সময় যাত্রা হতো, রাত জেগে সবাই যাত্রা দেখত, এখন আর হয় না।বেশ কয়েক বছর আগে সংসদ অধিবেশন দেখতে গিয়েছিলাম; সেইদিন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী মমতাজ বেগম স্পিকারের কাছে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে গান গাওয়ার নিরাপত্তা চেয়েছিলেন।

হাস্যরসবোধ মানুষের জন্মগত এবং হাস্যরসের অন্যতম উপায় হলো কৌতুক। নিষ্পাপ আনন্দ ও বৈধ বিনোদন ইসলামে জায়েজ; সীমারেখা নিয়ে মতভেদ আছে।তবে কৌতুক করতে হবে হালালভাবে, সবকিছু করতে হবে ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে থেকে, মিথ্যে বলা যাবে না।হাদিস শরিফে আছে, ‘ধ্বংস হোক ওই লোক যে মানুষ হাসাবার জন্য মিথ্যা কথা বলে।সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক’।কৌতুক আবার সব সময় করা যাবে না, কৌতুককে পেশায় পরিণত করা যাবে না।আমাদের ইসলাম ধর্মে কম হেসে বেশি বেশি কাঁদার নির্দেশনা রয়েছে।সুরা লুকমানের বলা হয়েছে, ‘আর মানুষের মধ্য থেকে কেউ কেউ না জেনে আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য বেহুদা কথা খরিদ করে, আর তারা ওইগুলো হাসি-ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে; তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাকর আজাব।’

সৃষ্টির শুরু থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষের জীবনের সাথে মিশে আছে হাসি-তামাশা ও কৌতুক।গল্প, নাটক, কৌতুক, সিনেমা ইত্যাদি পরিবেশনার মাধ্যমে নির্মল আনন্দ দেয়ার রীতি বহুযুগ পূর্ব থেকেই সমাজে প্রচলিত আছে।নাচ, গান, কৌতুক মানুষের নিরানন্দ জীবনে অনাবিল আনন্দ বয়ে আনে।মনের প্রশান্তি এবং বিষন্নতা দূর করতে বিনোদন জরুরী।কিন্তু অনৈসলামিক কৌতুক মুসলমানদের কাছে বিশেষ করে তালিবান সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়।কিন্তু কল্পনার মায়াময় জগত সৃষ্টি না করে সত্য ও বাস্তবতা দিয়ে মানুষ হাসানো সবচেয়ে কঠিন কাজ।মানুষ গণ্ডির বাইরে গিয়ে হাসতে পারবে না, গাইতে পারবে না, নাচতে পারবে না- এগুলো তালিবান রাষ্ট্রে প্রবর্তিত আইনে নিষিদ্ধ। আনন্দ যত নির্মলই হোক না কেন তা নির্ধারিত গণ্ডির বাইরে গিয়ে শরীয়তের নির্ধারিত রীতি ভঙ্গ করে সম্পাদন করলে তা হবে হারাম।তাই বোধ হয় মোহাম্মদ নজরকে প্রাণ দিতে হয়েছে।

নায়িকা পরীমনিকে নিয়েও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম বেশ সরগরম।তিন তিনবার তাকে রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে; জিজ্ঞেসাবাদে কি বেরিয়ে এসেছে তা এখনো জানা যায়নি।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু ঘটনা প্রচার করে তাকে হেয় করা হয়েছে।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপি’র বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে গ্রেফতার করার পর প্রতিদিন চমকপ্রদ খবর প্রকাশ পেতে থাকে।মামুন এবং তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খবর প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে মিডিয়াসহ বিভিন্ন তরফ থেকে প্রতিবাদ আসতে থাকে, সবার একটি কথা, কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে টানাটানি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।রাষ্ট্র তখন শুনেছিলো, কিন্তু এখন তেমন প্রতিবাদ হয় না।প্রায়ই দেখা যায়, সমাজের চোখে হেয় করার জন্য মিডিয়া কারো চরিত্রের খারাপ দিকটি বারবার তুলে ধরে; বিচারের আগেই তাকে সমাজের চোখে হেয় করতে উৎসাহ বোধ করে।যেদিন পরীমনিকে জামিন দেয়া হয় সেদিনও কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়া তার খোলামেলা পোশাকের নাচটিই উপস্থাপন করেছে।কিন্তু কারো চরিত্র নিয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করা শুধু অশোভন নয়, মানহানিকরও।মিডিয়ায় এ ধরনের মন্তব্য প্রচারিত হলে ব্ল্যাকমেইল করার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।আমাদের মনে রাখতে হবে সব শিল্পী সানি লিওনের মতো সাহসী নন।তবে অভিনয় শিল্পীকে অনেকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করে থাকে বিধায় তাদের সমাজ বা রাষ্ট্র বিরোধী কাজে জড়িত হওয়া বান্ছনীয় নয়।

 

লেখক

সাবেক নির্বাহী পরিচালক বাংলাদেশ ব্যাংক

সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন

ahmedzeauddin0@gmail.com

 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

ছোটদের জন্য লেখা