মুন্সশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
২০২১ সালে বিশ্বব্যাপী খ্যাতিমান বহু
মুসলিম মনীষী ও স্কলার ইন্তেকাল করেছেন। যাদের মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে ইসলামের দাওয়াত
মানুষের কাছে পৌঁছেছে। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুসলমানের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত
রেখেছিলেন। তাদের শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। তাদের কয়েকজনকে নিয়ে লিখেছেন দৈনিক
আলোকিত বাংলাদেশের সহ-সম্পাদক মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
শায়খ আলি জাবের আল হাদরামি
শায়খ আলি বিন সালেহ বিন মুহাম্মদ বিন
আলি জাবের আল হাদরামি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক স্কলার। তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রখ্যাত
আলেম ও প্রভাবশালী দাঈ ছিলেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ১৪ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার)
ইন্দোনেশিয়ার ইয়ারসি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়।
মুফতি ইরশাদ কাসেমি
তিনি ছিলেন মিয়ানমারের প্রবীণ আলেম
ও কারি। রোহিঙ্গাদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের সময় তার নাগরিকত্ব বাতিল করে তার ওপর অমানবিক
নির্যাতন চালানো হয়। পরে নিরূপায় হয়ে বাংলাদেশে হিজরত করতে বাধ্য হন। তিনি বার্মার
মংগডুর অধিবাসী ছিলেন। আরাকান মুসলিমদের একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ছিলেন। একসময়
বার্মার সরকারি চ্যানেলে কোরআন তেলাওয়াতের জন্য নির্বাচিত হন তিনি। দেশটির বিখ্যাত
কারি হিসেবে সরকারি চ্যানেলে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করতেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরনার্থী
শিবিরে ২০২১ সালের ১৮ জানুয়ারি (সোমবার) ১১০ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
ড. আবলা আল কাহলাবি
অধ্যাপক ড. আবলা আল কাহলাবি ছিলেন আরব
বিশ্বের প্রখ্যাত নারী ইসলাম প্রচারক। তিনি তার পিতার অনুরোধে মিসরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের জন্য ইসলামিক অ্যান্ড আরবি স্টাডিজ কলেজের ফিকহ (ইসলামি
আইন বিষয়) বিভাগের অধ্যাপনা শুরু করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টির বেশ কয়েকটি বিভাগে সুনামের
সঙ্গে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে কলেজ অব এডুকেশনের ইসলামি শরিয়া বিভাগের
প্রধান হিসেবে যোগ দেন। এর আগে তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে কলেজ অব এডুকেশন ফর গার্লস ও
আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্লস কলেজেও শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে
অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি ইসলামের প্রচার-প্রসারে নারীদের মধ্যে দাওয়াতি কাজ আরম্ভ করেন।
মিসরসহ সৌদি আরবের কাবা শরিফেও নারীদের দরসে অংশগ্রহণ করেন। অবশেষে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার
পর ফেইসবুক লাইভে দ্বীন প্রচারের কাজ আরম্ভ করেন। তার সর্বশেষ নিয়মিত প্রোগ্রাম ছিল
চিরস্থায়ী আমলবিষয়ক ‘আল বাকিয়াত আস সালিহাত’ নামক অনুষ্ঠান। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২১
সালের ২৪ জানুয়ারি (রোববার) ৭২ বছর বয়সে মিসরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
তার ইন্তেকাল হয়।
শায়খ বদর
আরব জাতিকে আহ্বানকারী সাহসী সন্তান
ছিলেন তিনি। ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রখ্যাত আলেম। মসজিদে আকসার প্রবীণ ও সংগ্রামী সেবক
ছিলেন এই শায়খ বদর আর রাজাবি আর রাফায়ি। দখলদার ইসরাইলি সেনাদের বুলেটের সামনে মসজিদে
আকসার গেটে দাঁড়িয়ে তিনি আরব জাতিকে বায়তুল মোকাদ্দাস রক্ষায় এভাবে আহ্বান করতেন,
‘হে আরব জাতি! আপনারা কোথায়? বায়তুল মোকাদ্দাস উদ্ধার করুন। এই যে দেখুন, আমি লাঠি
হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আপনাদের সহযোগিতায়।’ ১৯২৫ সালে তিনি ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেন।
মুক্ত স্বাধীন জেরুজালেমে তিনি বেড়ে উঠেছেন। বংশ-পরম্পরায় তিনি মসজিদে আকসার খাদেম
হিসেবে আবির্ভূত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও তিনি ফিলিস্তিনের বর্তমান ইসরাইল দখলকৃত
জেরুজালেমে অবস্থান করেন। মসজিদে আকসার সেবাদানকারীদের সন্তান হিসেবেই তাকে বিবেচনা
করা হয়।
মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মসজিদে
আকসার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ইসরাইলি সেনাদের বুলেটের উপস্থিতিও তাকে মসজিদে
আকসা থেকে সরাতে পারেনি। ১৯৬৭ সালে যখন দখলদার ইসরাইল ফিলিস্তিনের পবিত্রভূমি জেরুজালেম
ও মসজিদে আকসা দখল করে নেয়, মসজিদটির ওল্ডসিটির সব প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেয়, তখনও
বদর আল রাজাবি ছিলেন সাহসি সেবক। বার্ধক্যজনিত কারণে ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি (শনিবার)
৯৭ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
আলী তাশানকির
মৃত্যুর আগে ২০ বছরে ১ হাজার বারেরও
বেশি কোরআন খতমকারী ছিলেন তিনি। তুর্কী বংশোদ্ভুত বৃদ্ধ আলী তাশানকিরকে এক মাস আগে
অন্ত্রের ব্যাধিজনিত কারণে তুরস্কের সাকারিয়া রাজ্যের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তার অন্ত্রে অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। অবশেষে
২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ইন্তেকাল হয়। মৃত্যুকালে
তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। ২০ বছর ধরে তার নিয়মিত রুটিন ছিল পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা।
প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর তিনি পবিত্র কোরআন থেকে এক পারা তেলাওয়াত করতেন। সে
হিসেবে তিনি দৈনিক পাঁচ পারা কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তবে হাজার বারেরও বেশি কোরআন খতমের
বিষয়টি তার মৃত্যুর আগে কারও জানা ছিল না।
ইয়াহইয়া হামজা
পবিত্র জমজম কূপের উন্নয়ন ও সেবাদানকারী
ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী ড. ইয়াহইয়া হামজা কোশক। তিনি সৌদি আরবের প্রকৌশলীদের জনক হিসেবে
পরিচিত ছিলেন। জমজম কূপের উন্নয়নে পরিকল্পনা অনুযায়ী অনেক উন্নয়ন কাজের জনক ছিলেন ড.
কোশক। তিনিই প্রথম জমজমের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে কূপের ভেতর প্রবেশ করেছিলেন।
তিনি সৌদি আরবের ন্যাশনাল ওয়াটার কোম্পানির মহাপরিচালক ছিলেন। সৌদির প্রেস ও প্রকাশনা সংস্থার সদস্যও ছিলেন তিনি। পবিত্র নগরী মক্কার এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম নেন প্রকৌশলী ড. ইয়াহইয়া হামজা কোশক।
তার পিতা মক্কার বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তার পিতা হজের মৌসুমে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ তুর্কি থেকে আগত হজ-ওমরা পালনকারীদের সেবা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২১ সালের ১ মার্চ (সোমবার) ৮০ বছর বয়সে ড. ইয়াহইয়া হামজা কোশকের ইন্তেকাল হয়।
শায়খ আলি আস সাবুনি
শায়খ মুহাম্মদ আলি আস সাবুনি ছিলেন
কাবা শরিফের সাবেক অতিথি ইমাম। সিরিয়ায় জন্মগ্রহণ করলেও তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সৌদি
আরবের উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয় এবং মক্কার বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া
অনুষদে শিক্ষকতা করেছেন। কোরআনুল কারিমের তফসির নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা
করেছেন। শায়খ আস সাবুনি পবিত্র মক্কার মসজিদে হারাম তথা কাবা শরিফে ৫৭ বছর আগে ইমামতি
করেছিলেন। তিনি ১৩৮৫ হিজরির রমজান মাসে কাবা শরিফে তারাবি নামাজের ইমামতি করেছিলেন।
২০২১ সালের ১৯ মার্চ (শুক্রবার) ৯১ বছর বয়সে তুরস্কের ইয়েলওয়াতে তার ইন্তেকাল হয়।
ওয়ালি রাহমানি
অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের
সাবেক সেক্রেটারি ছিলেন মাওলানা ওয়ালি রাহমানি। তিনি ১৯৪৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার
দাদা ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ আলি মুঙ্গেরি (রহ.)। যিনি লক্ষ্মৌর বিশ্ববিখ্যাত ধর্মীয়
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম সদস্য ছিলেন।
১৯৭৪-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মাওলানা রাহমানি বিহার রাজ্যের আইন সভার অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বিধানসভার সাবেক সদস্যও ছিলেন। মুঙ্গেরের খানজা-ই রাহমানির পীর ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রতিষ্ঠান রাহমানি ৩০ প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা এবং ইমারতই শরিয়ার প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগে তিনি করোনা আক্রান্ত ছিলেন বলে জানা যায়।
২০২১ সালের ৩ এপ্রিল (শনিবার) ৭৮ বছর বয়সে বিহার রাজ্যের পাটনা জেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তার ইন্তেকাল হয়।
মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান
বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন
খান হলেন ভারতের খ্যাতনামা আলেম ও তাজকিরুল কোরআনের লেখক। তিনি দিল্লির মাইনরিটি কমিশনের
সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯২৫ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে তার জন্ম। ভারতে শান্তি
প্রতিষ্ঠায় তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ
পুরস্কার ‘পদ্ম বিভূষণ’ পদক দেওয়া হয়। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ২১ এপ্রিল (বুধবার)
৯৬ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
মাওলানা আবু ইবরাহিম সিদ্দিকি
মাওলানা আবু ইবরাহিম সিদ্দিকি আল কোরাইশি
ছিলেন ভারতের হুগলী জেলার ফুরফুরা দরবারের পীর। ফুরফুরার মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক আল
কোরাইশি (রহ.) তার দাদা এবং মাওলানা আবদুল হাই সিদ্দিকি আল কোরাইশি তার বাবা। তিনি
পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও বাংলাদেশে অনেক মাদরাসা-মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। দ্বীন ও ইসলাম
প্রচারে তার ব্যাপক অবদান ছিল। ২০২১ সালের ২ মে (রোববার) তার ইন্তেকাল হয়।
মাওলানা খলিল আমিনি
তিনি ছিলেন ভারতের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের জনপ্রিয় শিক্ষক ও আরবি সাহিত্য বিশারদ। মাওলানা
নুর আলম খলিল আমিনি ভারত থেকে প্রকাশিত আরবি সাহিত্যের ম্যাগাজিন ‘আদ দাঈ’-এর প্রধান
সম্পাদক ছিলেন। আরবি ও উর্দুতে লিখিত তার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রয়েছে। যেগুলোর
কয়েকটি বিভিন্ন দেশের মাদ্রাসাগুলোতে সিলেবাস হিসেবে পড়ানো হয়। ১৯৫২ সালের ১৮ ডিসেম্বর
বিহারের সিতামরাহি জেলার রায়পুর গ্রামে তার জন্ম।
তিনি ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল সার্টিফিকেট
অফ অনার লাভ করেন। দেওবন্দের আরবি সাহিত্যের জনপ্রিয় এ শিক্ষক বিশ্বের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের
কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। তার লিখিত বইগুলোর মধ্যে ‘ফিলিস্তিন ফি ইন্তিজারি সালাহিদিন’
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার অন্তর্ভুক্ত। আর ‘মিফতাহুল আরব’ নামক বইটি দেশ-বিদেশের
বিভিন্ন মাদ্রাসায় দরস নেজামির সিলেবাসভুক্ত। ২০২১ সালের ৩ মে (সোমবার) ৭৮ বছর বয়সে
তার ইন্তেকাল হয়।
শায়খ আল আজলান
শায়খ আবদুর রহমান আল আজলান ছিলেন মসজিদুল
হারামের প্রবীণ মুয়াজ্জিন। ১৩৫৭ হিজরি মোতাবেক ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে রিয়াদের পার্শ্ববর্তী
প্রদেশ আল কাসিমে তার জন্ম। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি আল কাসিম অঞ্চলের বিচারপতি হিসেবে
দায়িত্ব পালন করেন। এরপর গত ৩৫ বছর ধরে মসজিদে হারামে ইসলামের নানা বিষয় নিয়ে অধ্যাপনায়
যুক্ত ছিলেন। শায়খ আজলান মসজিদুল হারামে উলুমুশ শরিয়া তথাশরিয়া বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদান
করতেন। পুরো বছরেই তিনি তার দরস চালু রাখতেন।
তার দরসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিপুলসংখ্যক হজ-ওমরা পালনকারী শিক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করতেন। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরও তিনি অনলাইনে তার দরস চালু রেখেছিলেন। ২০২১ সালের ৭ মে (শুক্রবার) ৮৫ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
মাওলানা হাবিবুর রহমান আজমি
দারুল উলুম দেওবন্দের প্রবীণ শিক্ষক
ছিলেন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মাওলানা হাবিবুর রহমান আজমি। তিনি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে
দারুল উলুম দেওবন্দে অধ্যাপনার দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা আজমি দীর্ঘদিন মাসিক পত্রিকা
‘দারুল উলুম দেওবন্দ’-এর সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের ওয়ার্কিং
কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তিনি ইতিহাস, বিজ্ঞান ও গবেষণামূলক প্রচুর বই লিখেছেন।
হাদিসশাস্ত্রের বর্ণনাকারীদের ইতিহাসে ছিলেন প্রাজ্ঞ। ২০২১ সালের ১৩ মে (বৃহস্পতিবার)
৭৭ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
সাইয়েদ উসমান মানসুরপুরী
সাইয়েদ মাওলানা কারি উসমান মানসুরপুরী
ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম ও জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের (একাংশ)
সভাপতি। ১৯৪৪ সালের ১২ আগস্ট ভারতের মুজাফফরনগর জেলার মনসুরপুরে তার জন্ম। বাড়িতে পারিবারিকভাবে
প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তার বাবা নওয়াব মুহাম্মদ ঈসা। তিনি ১৯৬৫ সালে ভারতের দারুল
উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন। এ সময় তিনি কারি হাফিজুর রহমান ও কারি
আতিকের কাছে কেরাত বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করেন। খ্যাতনামা আরবি সাহিত্যিক মাওলানা ওয়াহিদুজ্জামান
কিরানভির কাছে আরবি সাহিত্যে উচ্চতর পাঠ সম্পন্ন করেন। ১৯৬৬ সালে শাইখুল আরব ওয়াল আজম
মাওলানা সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর কন্যা ইমরানা খাতুনের সঙ্গে বিয়েবন্ধনে
আবদ্ধ হন। তিনি পাঁচ বছর বিহারের গয়ার মাদরাসা কাসেমিয়া এবং ১১ বছর আমরোহার মাদ্রাসা
ইসলামিয়া আরবিয়ায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৮২ সালে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক হিসেবে
নিযুক্ত হন। মুয়াত্তা ইমাম মালিক ও মিশকাতুল মাসাবিহ-এর মতো হাদিস গ্রন্থের পাঠদান
করেন। ২০০৮ সালের ৫ এপ্রিল তিনি জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সর্বভারতীয় সভাপতি নির্বাচিত
হন। ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দারুল উলুম দেওবন্দের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব
পালন করেন। ২০২০ সালের অক্টোবরে তিনি দেওবন্দের কার্যনির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত
হন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘রদ্দে কাদিয়ানিয়াত’। তিনি ২০২১ সালের ২১
মে (শুক্রবার) করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নয়া দিল্লির গুরুগাও শহরের একটি বেসরকারি
হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। দেওবন্দের কাসেমি কবরস্থানে
তাকে সমাহিত করা হয়।
হিচেম ডাইয়েত
তিউনেশিয়ার বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ও ইসলামিক
স্কলার ছিলেন হিচেম ডাইয়েত। ৬ ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে তিউনেশিয়ার তিউনিসে এক মধ্যবিত্ত
পরিবারে তার জন্ম। তার বাপ-দাদা ও আত্মীয়-স্বজনের অনেকেই বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ও
বুদ্ধিজীবী ছিলেন। ইসলামি আইনশাস্ত্র তথা ইলমে ফিকহের সঙ্গে ডাইয়েত পরিবারের সম্পর্ক
ছিল সুগভীর। হিচেম ডাইয়েত তিউনিশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যামিরেটস প্রফেসর ছিলেন। এ ছাড়াও
তিনি কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। তিনি ইউরোপিয়ান একাডেমির বিজ্ঞান ও কলা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তিনি ইসলাম ও আধুনিক দর্শন নিয়ে অনেক বই রচনা করেন। তার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো,
ইউরোপ অ্যান্ড ইসলাম (১৯৭৮), দ্য গ্রেট ফেতনা (১৯৮৯), ইসলামিক কালচার ইন ক্রাইসিস
: এ রিফ্লেকশন অন সিভিলাইজেশনস ইন হিস্টোরি (২০১১), দ্য লাইফ অব মুহাম্মদ : প্রিডিকেশন
ইন মক্কা (২০১৪), দ্য লাইফ অব মুহাম্মদ : রিভিলেশন অ্যান্ড প্রোফেসি (২০১৪)। ২০২১ সালের
১ জুন (মঙ্গলবার) ৮৬ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
শায়খ মহিউদ্দিন
মসজিদে নববী থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে
‘কারবান ও তাজুরি’ এলাকায় শায়খ মহিউদ্দিনের বাড়ি। তিনি নিয়মিত মসজিদে নববীতে পায়ে হেঁটে
এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। তিনি ছিলেন মদিনা নগরীর প্রবীণদের অন্যতম। ইসলামের
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর বংশধর। ইসলামের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও
আলেম মহিউদ্দিন ইবনে আরাবি (রহ.) ছিলেন তার পূর্বপুরুষ। ২০২১ সালের ১৯ জুন (শনিবার)
১০৭ বছর বয়সে পবিত্র মদিনায় তার ইন্তেকাল হয়। মসজিদে নববীতেই তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজা শেষে তাকে বাকিউল গারকাদ (জান্নাতুল বাকি)-এ দাফন করা হয়।
আহমদ জিবরিল
তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনের
নেতা ও পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন-এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৩৮ সালে ফিলিস্তিনের
ইয়াফা শহরের নিকটবর্তী ইয়াজুরা গ্রামে তার জন্ম। ১৯৬০-এর দশকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার
লক্ষ্যে কাজ আরম্ভ করেন আহমদ জিবরিল। তিনি ১৯৫৬ সালে মিসরের সামরিক একাডেমিতে ভর্তি
হন। ১৯৫৯ সালে সেখান থেকে সাফল্যের সঙ্গে কমিশন লাভ করে অফিসার পদে সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে
যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে সিরিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আমিন আল হাফেজের সঙ্গে মতপার্থক্যের
জের ধরে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে সার্বক্ষণিক প্রতিরোধ সংগ্রামে যোগ দেন। তিনি
ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি সশস্ত্র প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলে এবং দখলদার
ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। দামেস্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২১ সালের
৭ জুলাই (বুধবার) ৮৭ বছর বয়সে তার ইন্তেকাল হয়।
শায়খ নেয়ামতুল্লাহ তুর্কি
জীবনের বেশিরভাগ সময় ইসলামের দাওয়াত
নিয়ে বিশ্বভ্রমণকারী তুরস্কের বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার ছিলেন শায়খ নেয়ামতুল্লাহ তুর্কি।
১৯৩১ সালে তার জন্ম। উসমানি সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান আবদুল হামিদের শাসনামলে অনেক আলেমের
কাছে তিনি শিক্ষার্জন করেন। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এশিয়া ইউরোপসহ বিশ্বের ৫৫টি দেশে সফর
করেছেন তিনি।
২০২১ সালের ৩০ জুলাই (শুক্রবার) ৯০ বছর বয়সে ইস্তানবুলে তার ইন্তেকাল হয়।
Source: FB-মুন্সশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ
