ভ্রমনগল্প- রাঙ্গামাটি - পর্ব-০৯
মোঃ আবদুল হাই
❑
নির্জন ইবাদতের কথা প্রকাশ করতে নেই। আমি প্রকাশ
করছি এইজন্য যে, অনেককে দেখলাম হৈ হুল্লোড়, চেঁচামেচি, গান বাদ্য এসব করছে।পাহাড়ের
নৈশব্দে ব্যঘাত সৃষ্টি করছে। আমার এই লেখা পেয়ে একজনও যদি সচেতন হয়!
ভোরের আলো ফোটার আগেই তায়াম্মুম করে ফজর পড়ে
নিলাম। তাবুর ভিতরে বসেই সূর্য উঠা দেখলাম। চন্দ্র সূর্যের উদয় অস্ত প্রতিদিনই হয়।
কিন্তু পাহাড়ের উপর থেকে সেটা যে এতটা মনোমুগ্ধকর হবে, বুঝিনি। কোনো ভাষায় সেটা
প্রকাশ করা যাবে না।
ওয়াসরুম নিয়ে যাদের খুঁতখুঁত আছে, তারা মারায়নতং
না আসাই ভালো। কেনা পানি ব্যবহার করতে হয়। অনেক বড় লাইনে দাঁড়াতে হয়। কতৃপক্ষ এ
নিয়ে কী ভাবছেন কে জানে।
সূর্য উঠার পর পাহাড়ের গায়ে মেঘ কুয়াশার খেলা
শুরু হয়ে গেল। মেঘগুলো কোথা থেকে যেন ধেয়ে আসে। পাহাড়, পাহাড়ি গাছ ক্রমান্বয়ে
ঢাকতে থাকে। আবার একটু পরে উধাও হয়ে যায়। সবুজ পাহাড়কে তখন পরিষ্কার দেখা যায়। চোখ
আর মন জুড়ানো এই খেলা ঘন্টার পর ঘন্টা চলতে থাকে।
প্রাণ ভরে সব দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, আমার বাইক?
সাথে সাথে সব গুটিয়ে, দাদার পেমেন্ট করে নিচু রাস্তার পথ ধরলাম। এখন শুধু নামা আর
নামা। রাতের অন্ধকারে বাইক কোথায় রেখেছিলাম ভুলেও গেছি। সারাক্ষণ দোয়া কালাম
পড়ছিলাম। দূ-রে খেলনা বাইকের মত ছোট আমার বাইকটা দেখা আমার কাছে এই মুহূর্তে পাহাড়
দেখার চেয়েও রোমাঞ্চকর। আলহামদুলিল্লাহ। সব ঠিক আছে। বেধে ফেললাম সব কিছু। এবার
কারো সাহায্যের জন্য অপেক্ষা। ৭০ ডিগ্রি এঙ্গেলে আটকে থাকা বাইকটাকে বিপরীত দিকে
ঘোরানো আমার একার পক্ষে অসম্ভব।
চারজন পাহাড়িকে দা হাতে নিচ থেকে উপরের দিকে উঠতে
দেখলাম। আমার দুঃখের কথা বুঝিয়ে বললাম। তারা চ্যাংদোলা করে বাইকটাকে ঘুরিয়ে ফেললো।
আমি ব্রেক চেপে ধরে স্টার্ট করলাম। চারজনকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিলাম। তারাও কেন
জানি প্রাণ খুলে হাসছিল। মানুষের হাসি কান্নার রহস্য অনেক সময় শুধু এক বিধাতাই
জানে। আমি অল্প কয়টা টাকা ওদের হাতে গুজে দিয়েছিলাম। কিন্তু এত অল্প পুরস্কারে এত
খুশি হওয়ার কথা না।
আমি যত জায়গায় ঘুরেছি পাহাড়িদের অল্পে খুশি,
আন্তরিক পেয়েছি। উপকারী, সাহায্যকারী পেয়েছি।
মারায়নতং এর উবাচিং মারমাকে অনেকেই জানেন। রাত
বারোটায় গিয়েও যদি বলেন, দাদা তাবু লাগবে, দুইটা কম্বল দেন। কোনো না নাই।
ব্রেক চেপে চেপে অতি সাবধানে নেমে এলাম মারায়নতং
থেকে। একটু থেমে পিছন ফিরে তাকালাম। গত বারো ঘন্টার এডভেঞ্চার আমার কাছে ভয়ের না,
সুখস্বপ্ন ভাঙ্গার অনুভূতি। আমি বাইকের ব্যাক মিররে ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে
আছি। বুকের ভেতর কেমন জানি মোচড় অনুভব করছি।
আমি এখন ঢাকায় ফেরার পথে। আজ আমাকে রাইড করতে হবে
৩৬২ কি.মি. পথ। কাল স্কুল খোলা।
(চলবে) ……
