ADS

ভ্রমনগল্প- রাঙ্গামাটি - পর্ব-০৮


ভ্রমনগল্প
- রাঙ্গামাটি - পর্ব-০৮

মোঃ আবদুল হাই 

ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারপাশে উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি। পায়ের নিচের রাস্তাটা আধাপাকা ইটের সলিং। আকাশে হাজার তারার মেলা। আমার এখনকার টার্গেট মারায়নতং পাহাড়ের চূড়ায় উঠা। সম্পূর্ণ একা অপরিচিত অন্ধকারে ভয় না, একটু অস্বাভাবিক লাগছে। নিচের দিক থেকে এগিয়ে আসা আলোটা ক্রমেই আমার কাছাকাছি পৌঁছাতে শুরু করেছে। আমার মনে পড়ছে কয়টা গানের কলি---

o Allah,

I need you here with me.

Lord i need your help.

Big lights pull me in every time. (Haris j)

আলো যার হাতে, সে পথের পাশে কংক্রিটের গার্ডারের উপর আমাকে একা বসে থাকতে দেখে হতচকিত হলো। খুশি হলো না ভয় পেল বুঝা গেল না। স্বাভাবিক করার জন্য আমিই প্রশ্ন করলাম, ভাই কি ট্রাভেলার?

আলোঃ জী।

আমিঃ কোথা থেকে?

আলোঃ চকোরিয়া।

আমিঃ ভালোই হলো। গল্প করতে করতে যাবো।

এই আলো বাহকের নাম জমির আলি। মাছের ব্যবসা। নিজের পিক আপে মাছ নিয়ে ৬৪ জেলায় ঘুরে বেড়ান। উনি শুনেছেন মারায়নতং নাকি মঙ্গল গ্রহের মত। আমরা ঘন ঘন জিরিয়ে নিচ্ছি। গল্প করছি। লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে আবার শূণ্যে উড্ডয়ন। এক জায়গায় কংক্রিটের রোড সেফটি গার্ডার শেষ। বসার জায়গা নেই। আমি রাস্তার উপরেই বসে পড়লাম। আমার সাথে সাথে জমির আলিও। অন্ধকার। শুনশান নিরব। এক মিনিটের মাথায় জমির আলির প্রশ্ন, কিছু শুনতে পাচ্ছেন?

আমিঃ কী?

জমিরঃ ঝুনঝুনির আওয়াজ।

আমিঃ কই?

জমিরঃ আমিতো স্পষ্ট শুনলাম।

এটা হলো বিষধর সাপের চলাচলের শব্দ। আমি এই শব্দ শুনে অভ্যস্থ। আমার এলাকায় প্রচুর বিষধর সাপ। বসা আর হলো না। এখনই সাপের সাক্ষাৎ কাম্য নয়।

একেবারে যখন চূড়ায় উঠলাম। মাঘ মাসের শীত। আমাদের গায়ে সেন্ডো গেঞ্জি ছাড়া কিছুই নাই। তাও ঘামে ভিজে একসার।

এবার ঝটপট কিছু কাজ সারতে হবে।

(১)তাবু ভাড়া করা।

(২)ডিনারের অর্ডার করা।

(৩)তায়াম্মুম করে নামাজ আদায়।

(৪) বিছানা রচনা।

(৫) টর্চের আলোয় চারপাশটা যতটা সম্ভব দেখে নেয়া।

(৬) ঘুমের দেশে চলে যাওয়া।

সারাদিনের ক্লান্তি, ট্র্যাকিং এর ধকল, বাইকের পেরেশানি সব মিলিয়ে এখন আমার বেহাল অবস্থা। আমি শোয়ামাত্র ঘুমিয়ে গেলাম। গভীর রজনীতে আমার তাবুর বাইরে কার যেন কন্ঠঃ

দাদা, ও দাদা, খাবার রেডি। উঠেন।

উবাচিং মারমা, তাবু আর খাবার দোকানের মালিক। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খাবারের সামনে বসলাম। ডিম ভাজি আলু ভর্তা, ডাল। অমৃতের মত লাগছিলো।

রাত তিনটা তিরিশ। আবারও ঘুম ভাঙলো। আমার তাবুর সামনেই শোরগোল। কী হয়েছে? চাঁদ উঠেছে। আমি আস্তে করে তাবুর এন্ট্রির দুই পরতের মধ্যে এক পরতের চেইন খুললাম। অন্য পরতে নেট। বাইরের সবকিছু দেখা যাবে, কিন্তু মশা ঢুকবে না।

আমি হতভম্ব! শেষ রাতের এই চাঁদ এত উজ্জ্বল হবে, আশা করিনি। চেইন খুলে দেয়ায় হুহু করে ঠান্ডা ঢুকছে। দুইটা কম্বলের একটা বিছানায় দিলাম। অন্যটা জ্যাকেটের উপর চড়ালাম।কানটুপি মাথায় বাধলাম। বসে বসে অনেকক্ষণ চাঁদের সাথে কথা বললাম। কথা বললাম চাঁদের যিনি মালিক, তাঁর সাথে। ছেলের কথা বললাম।কাঁদলাম। বাবার কথা বললাম। মা, ভাইবোনদের কথা বললাম। সবার জন্য মাগফিরাত চাইলাম। শেষ রাতের দোয়া নাকি কবুল হয়। গুটিশুটি মেরে আবার শুয়ে পড়লাম। মারায়নতং এতটাই উঁচু যে কাত হয়ে শোয়ার পর মনে হচ্ছে, চাঁদ আর আমার চোখ সমান্তরালে!

 

(চলবে) ……

মোঃআবদুল হাই 


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

ছোটদের জন্য লেখা