ADS

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা ❑ জিয়াউদ্দীন আহমেদ

 


কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা 

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

❑ 

অতি সম্প্রতি কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া এক নারীকে অপহরণ করে নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ধর্ষণ করে।সমুদ্র সৈকতে উক্ত নারীর স্বামীকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে এক যুবক বাকবিতণ্ডায় মত্ত হয় এবং পরবর্তীতে সন্ধ্যার দিকে পর্যটন গলফ মাঠের সামনে থেকে তার আট মাসের শিশুসন্তান স্বামীকে কয়েকজন যুবক অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যায় এবং অন্য আরেকটি অটোরিকশায় জনের আরেকটি দল ওই নারীকে তুলে নিয়ে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন নির্জন স্থানে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী আশিকুল ইসলাম নামের এক সন্ত্রাসী তার মোটরসাইকেলে উক্ত নারীকে তুলে নিয়ে একটি গেস্ট হাউজে উঠে এবং আশিকুল ইসলাম ধর্ষিতার পূর্ব পরিচিত। ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে ভেতরে রেখে বাইরে থেকে রুম বন্ধ করে আশিক হোটেল ত্যাগ করে।স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর স্বামীর ফোন পেয়ে ্যাব এসে তাকে রাত দুইটায় উদ্ধার করে।পুলিশ এই নারীকে বারবণিতা হিসেবে গণ্য করছে।পুলিশের মতে, দেহ ব্যবসায় প্রাপ্ত টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা দেয়া হলেও সন্ত্রাসী আশিক আরও ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবী করে, কিন্তু ভিকটিম তা দিতে সম্মত না হওয়ায় এই ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।বারবার কক্সবাজার যাওয়ার ব্যাপারে উক্ত নারী তার স্বামীর বক্তব্য হচ্ছে, তারা তাদের আট মাস বয়সী শিশু সন্তানের হার্টের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ১০ লক্ষ টাকা পর্যটকদের কাছ থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যে কক্সবাজার আসেন।

ধর্ষিতাকে বারবণিতা হিসেবে গণ্য করার প্রধান কারণ হচ্ছে, মোটরসাইকেলে তুলে মেইন রোড দিয়ে যাওয়ার সময় উক্ত নারী কোনো ধরনের চিৎকার-চেঁচামেচি করেননি।এছাড়া হোটেলে গিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রুম বুক করার সময়ও উক্ত নারী কোন প্রতিবাদ করেননি, বরং বরাদ্দ রুমের পথে হোটেলের কর্মচারী আশিকের সাথে কোন উচ্চবাচ্য না করেই তিনি হেঁটে চলে যান। তাদের রুমের উদ্দেশ্যে যাওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে; সেই ভিডিওতে উক্ত নারীকে কোন কথা না বলে তাদের পেছন পেছন হেঁটে যেতে দেখা গেছে।এই সকল তথ্য থেকে আমাদের মতো সাধারণ লোকের ধারণা হতে পারেমেয়েটি সত্যিই খারাপ। আমাদের সমাজ মেয়েদের দোষ বেশী দেখে।কোন প্রতিবাদী বা সংস্কারমুক্ত ভিকটিম মেয়েকে বেশ্যা বা বারবণিতা বানানো গেলে অপরাধী পুরুষের প্রতি সমাজের সব ক্ষোভ নিমিষে উবে যায়, সব ক্ষোভ পড়ে মেয়েটির উপর।কক্সবাজারেও তাই করা হচ্ছে না তো?

সন্ত্রাসী আশিক যখন বলে, ‘চেঁচামেচি বা ঘটনা প্রকাশ করলে তোর স্বামী বাচ্চাকে মেরে ফেলা হবেতখন সুবোধ বালিকার মতো আশিকের পেছনে পেছনে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো কি? তিনি তো দেখেছেন, তাকে শত শত লোকের সম্মুখ থেকে তুলে নিয়ে এসেছে, তার শিশু সন্তান স্বামীকে আলাদা টেক্সি করে নিয়ে গেছে, তারা তাদের হাতে জিম্মি।আশিককে যদি পূর্বে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই আশিকের দোর্দণ্ড প্রতাপ সম্পর্কে তিনি জেনেছেন এবং  বুঝতে পেরেছিলেন পুলিশের চেয়ে আশিকুল ইসলামের ক্ষমতা অনেক বেশী।আশিকুল ইসলাম তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, শুধু মাদকাসক্ত নয়, মাদক ব্যবসায়ীও।তার বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হত্যা, ছিনতাই, নারী শিশু নির্যাতনসহ অবৈধ অস্ত্র মাদক সংশ্লিষ্ট মোট ১৬টি মামলা রয়েছে।তার নেতৃত্বে ৩২ জনের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপও নাকি রয়েছে। ইতোপূর্বে পাঁচ বার তাকে ধরা হয়েছে, কয়েক বছর জেলেও ছিলো, এখন সবগুলো মামলায় জামিনে আছে। কক্সবাজার মাদকের স্বর্গরাজ্য।মাদক এলাকার সন্ত্রাসীরা তুলনামূলকভাবে বেশী ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর হয়ে থাকে।আরেকটি বিষয়ও মেয়েটি ভাবতে পারে এবং তা হচ্ছে, তার শিশু সন্তানকে বাঁচানোর স্বার্থে আশিককে চাঁদা বাবত আরও ৫০ হাজার টাকা দেয়ার চেয়ে দেহ দেয়া অনেক বেশী লাভজনক। মা কাছে দেহের সূচিতার চেয়ে সন্তানের জীবন বাঁচানো অনেক বেশী মূল্যবান।তাই হয়তো ভিকটিম কোন উচ্চবাচ্য করেনি।

ধর্ষিতা নারী পেশাদার বারবণিতা হলেও তার সম্মতি ব্যতিরেকে জোর করে কেউ যৌনকর্ম করার অধিকার রাখে না।বারবণিতার সাথে যৌনকর্ম করতে হলে আগে চুক্তি করতে হয়। অনেককে পেটের দায়ে দেহ ব্যবসা করতে হয়, অভুক্ত সকল মানুষের দায় রাষ্ট্র বা সমাজ নেয় না।কক্সবাজারের ভিকটিম নারীর সন্তান, স্বামী এবং সন্তানের অসুস্থ্যতা সব মিথ্যে হলেও এভাবে জিম্মি করে যৌনকর্ম করা অপরাধ। ভদ্রমহিলা শুধু অর্থ কামানোর উদ্দেশ্যে দেহ ব্যবসা করলেও সন্ত্রাসী আশিক তার আয়ে ভাগ বসাতে পারে না।অরাজকতা চরম পর্যায়ে না পৌঁছলে চাঁদা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা একজনকথিতবারবণিতাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করার সাহস পেত না।দেহ ব্যবসা নেই এমন একটি দেশও পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।যে কয়টি দেশে এই ব্যবসার স্বীকৃতি রয়েছে সেই সকল দেশে এরা যৌনকর্মী, অর্থাৎ দেহ ব্যবসা একটি পেশা।অন্যদিকে যে সকল দেশে নিষিদ্ধ সেই সকল দেশেও যৌনকর্মীদের অভিযোগের ভিত্তিতে কাস্টমার থেকে টাকা আদায় করে দিতে পুলিশকে তৎপর হতে দেখা গেছে। অভিযুক্তদের সাথে ধর্ষিতার পূর্ব পরিচয় থাকা বা না থাকা মুখ্য বিষয় নয়; ধর্ষিতা নারী বারবণিতা, নাকি সতী তাও বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়।যৌনকর্মে সম্মতি অপরিহার্য।

কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার পর্যটকের সমাগম দেখানো হয়েছে।পুলিশ বলেছে, তারা সতর্ক তৎপর রয়েছে, দুই বা তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।তবে এটা ঠিক যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত কঠোরই হোক না কেন সব অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়।কারণ একই সময় প্রতিটি এলাকার প্রতিটি লোককে পাহারা দিয়ে রাখা অসম্ভব।তবে এক্ষেত্রে শুধু পুলিশকে দায়ী করা যাবে না, পুলিশ তো প্রধান আসামীর বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা করেছে, শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা তো পুলিশের নেই।বর্তমান সরকারের আমলে প্রবর্তিত ৯৯৯ নম্বর জরুরি কল সেন্টার সেবার আশ্বাসে জনগণ আশ্বস্ত হয়েছিলো।পুলিশের অধীনে পরিচালিত এই জরুরী সেবা শুধু পুলিশ নয়, ফায়ার সার্ভিস এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবাও পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।সপ্তাহে দিন ২৪ ঘণ্টা চালু রয়েছে এই সেবা।দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ এই সেবার জন্য ফোন করতে পারে।কক্সবাজারের ঘটনায় ৯৯৯- ফোন করেও কল সেন্টার থেকে সহায়তা পাওয়া যায়নি।সত্য হলে বিষয়টি সত্যি উদ্বেগের।

বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের ধর্ষণের ঘটনাটি শুনে দেশবাসীর খুব বেশী প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি।কারণ ধর্ষণের ঘটনা শুনতে শুনতে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।ধর্ষণ শুধু কক্সবাজারে নয়, দেশের সর্বত্র হচ্ছে; ধর্ষণ করছে মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, স্কুলের শিক্ষক, মাদকসেবক, প্রেমিক, সন্ত্রাসী, মাস্তান, বাস-ড্রাইভার, বাসের হেলপার এবং স্বামী প্রবর।কিন্তু কক্সবাজারে এই ধর্ষণের ঘটনাটি অনেক বেশী স্পর্শকাতর; কারণ এই ধর্ষণ জাতীয় স্বার্থকে নাড়া দিয়েছে।কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর একমাত্র দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্র সৈকত।কক্সবাজারকে আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লাখ কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে সরকার।সমুদ্রের ভেতর হবে বিমান উঠানামার রানওয়ে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য সৈকতে আলাদা মনোরম স্থান।দু:খজনক হচ্ছে, পৃথিবীর দীর্ঘতম বালুময় সৈকত হওয়া সত্বেও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে কোন বিদেশি পর্যটককে দেখা যায় না। দুয়েকজন এলেও তারা তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজ দেশে ফেরত যায়; দেশে গিয়ে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লব্ধ তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে, এভাবে আমাদের দেশ সম্পর্কে একটি খারাপ ধারণা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয়।দুই বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার এক পর্যটক মহিলাকে কক্সবাজারে রিসোর্টের দুইজন কর্মচারী ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলো, ধর্ষণচেষ্টার সময় ধস্তাধস্তিতে ওই নারী আহত হন।১৯৮৭ এবং ২০০৫ সনেও বিদেশি পর্যটককে ধর্ষণ করা হয়।শুধু নিরাপত্তা নয়, বিদেশিদের বিনোদনেরও কোন স্বস্তিদায়ক ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই।সৈকতে ইজি চেয়ারে শুয়ে বই পড়তে পড়তে বিয়ার খাওয়ার আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ পৃথিবীর অনেক মুসলিম অধ্যুষিত দেশে থাকলেও আমাদের দেশে নেই।সুইম কস্টিউম পরা কোন বিদেশি নারী সৈকতে গেলে বা সমুদ্রে সাঁতার কাটলে মৌমাছির মতো ঝাকে ঝাকে বাঙ্গালী দৃষ্টিকটু ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকবে, তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেবে।কিন্তু যে সৈকতের ভেতরের নিরাপত্তাও পুলিশ দিয়ে রক্ষা করতে হয় সেই সৈকতে যারাই যাক না কেন, বিদেশিরা যাবে না। ধর্মে যাই থাকুক না কেন, সভ্য নীতি হচ্ছে, বেশ্যা-বউ নির্বিশেষে  যৌনকর্মে তাদের স্বত:স্ফূর্ত সম্মতি অপরিহার্য।

লেখক : নির্বাহী পরিচালক  (সাবেক) বাংলাদেশ ব্যাংকের

এবং

ব্যবস্থাপনা পরিচালক (সাবেক) সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের

ahmedzeauddin0@gmail.com

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

ছোটদের জন্য লেখা