মোঃ আবদুল হাই
❑
রহস্য ভেদ হয়েছে। দরজায় ছিটকিনি ছিল না। দরজা খুলেছে পাহাড়ি দমকা হাওয়া। আর শব্দ? আমার মোমবাতির আগুনের উপর পাহাড়ি এক পোকা বসামাত্র তার পেট ফেটে যায়। আর তাতেই বিচিত্র শব্দ হয়। আমি সামান্য ট্রাভেলার। ভুত, পেত্নী, অশান্তি বাহিনী, বিশেষ আপ্যায়নের মোহ ওসব নিয়ে ভাবলে ট্রাভেল করব কিভাবে?
পোকার ডেড বডি সরালাম। পারসোনাল নেচারাল ডিউটি সারতে বাইরে বেরুলাম। বাইরে তখন জোসনা পাহাড়কে গিলার জন্য হা করে আছে। আমি আর ঘরে ঢুকলামনা। জোসনা, পাহাড় আর মেঘ-কুয়াশার খেলা দেখতে দেখতে পড়লাম, সুবহানাল্লাহ।
জায়নামাজ বিছিয়ে চলে গেলাম অন্য জগতে।যেখানে দুঃখ-কষ্ট নেই। হতাশা আর বঞ্চনা অনুপস্থিত। যেখানে মৃত পুত্রের সাথে, বাবার সাথে দেখা হয়ে যায়। কথা হয়। কথা হয় এই সব কিছুর যিনি মালিক, তাঁর সাথে।
মোবাইলে সময় দেখে ফজর পড়লাম। মোবাইলের আলোতেই বিছানাপত্র গুছিয়ে বাইকের কেরিয়ারে শক্ত করে বাঁধলাম। কুয়াশায় পাহাড়ের মাটি আধভেজা হয়ে আছে। অতি সাবধানে তিনটা ব্রেক ব্যবহার করে পাকা রাস্তায় নামলাম। (১) ইঞ্জিন ব্রেক (২) ফ্রন্ট ব্রেক (৩) রেয়ার ব্রেক। এই তিন ব্রেক ব্যবহার করতে যারা অভ্যস্থ নন, তারা please পাহাড়ে আসবেন না।
গরম কাপড়চোপড় যা ছিল, সব নিয়েছিলাম। হাফ গ্লাভস পরাতে ঠান্ডায় আংগুলের অগ্রভাগ অবশ হয়ে গেছে। ছুটলাম আমি রাংগামাটির দিকে। ডানে বামে যেদিকেই চোখ যায়, অভিভূত হই। বেতছড়ি বগাছড়ি, হরিণা,কুতুব ছড়ি নাম পড়তে পড়তে আগাতে থাকি। আমার বাইককে উদ্দেশ্য করে বলি:
ও কোন বাঁকে কি ধন দেখাবে
কোনখানে কি দায় ঠেকাবে।
কোথায় গিয়ে শেষ মেলে যে
ভেবে না কুলায়রে আমার মন ভুলায়রে।
গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ
আ-মা-র মন.....................।
লাল সূর্যটা কুয়াশা ভেদ করে উঠে এসেছে।আমার হঠাৎ মনে হলো বাইকের তেল ফুরিয়েছে। রিজার্ভ তেল রাঙ্গামাটি পর্যন্ত যাবে তো! মাইলস্টোনে দেখলাম রাঙ্গামাটি ১০ কি.মি.।
তেল পাওয়া গেল পাম্পে না, মুদি দোকানে।
এখানকার দোকানিরা অকটেনের বোতল সাজিয়ে বসে থাকে।রাঙ্গামাটির ঘাগড়া এসে ওয়াসরুম, নাস্তা করা ব্যয়াম করা সেরে নেই। লাঞ্চের জন্য প্যাকেট খাবার নিয়ে আবার ছুটলাম কাপ্তাই চন্দ্রঘোনার দিকে। এবারের টার্গেট বান্দরবান।
পিচ ঢালা পথে চুনকালিতে কিছু লেখা চোখে পড়লো -
তোমাদের বিনোদন
আমাদের মরণ।
তোমাদের পর্যটন
পাহাড়িদের মরণ।
সেনাবাহিনী আবার লেখাগুলো মোছার চেষ্টা করেছে। পাহাড়ি বাঙ্গালির এই বৈরিতার অবসান হবে কবে? কে জানে।
চন্দ্রঘোনায় এসে কর্ণফুলি নদী পার হতে হয় ফেরিতে করে।ফেরিতে বাইক তুলে সাইড করে টুথব্রাশ নিলাম। সময় অপচয় একদম না। আগে নদী দেখলে তাকিয়ে থাকতাম। এখন তাকালে ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে।
এসময় আবুল ফজল নামে এক বাইকারের সাথে আমার কথা হয়। উনি আমাকে সামনে যেতে বারণ করলেন। অনিরাপত্তার ইঙ্গিত দিলেন। আমি না শোনার ভান করলাম।
ফেরি পার হয়ে আবার ছুটে চলা। উঁচু নিচু পাহাড়, আকা বাঁকা পথ আমি আবার থামলাম সুন্দর একটা ভিউ পয়েন্টের আকর্ষনে। দুপুরের ঝলমলে রোদে পাহাড় যেন অন্য রুপ ধারণ করেছে। বক্স থেকে হেমোক বের করে দুইটা গাছে বাঁধতে যাব। এমন সময় ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে এক পাহাড়ি বের হয়ে আসলো। হাতে চকচকে ধারালো দা৷। এগিয়ে আসছে আমার ই দিকে।
(চলবে) ……
